রাজশাহীতে কারুশ্রী জুয়েলার্সে চুরি : ৮ জন গ্রেফতার, স্বর্ণ-রূপা ও ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার
রাজশাহী নগরীর সাহেববাজার স্বর্ণপট্টির কারুশ্রী জুয়েলার্সে আলোচিত চুরির ঘটনায় আন্তঃজেলা চোর চক্রের সাত সদস্য এবং চোরাই স্বর্ণ কেনার অভিযোগে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীসহ মোট আটজনকে গ্রেফতার করেছে মহানগর পুলিশের (আরএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে চুরি যাওয়া ২৬ ভরি স্বর্ণ, ৬২ ভরি রূপা এবং চোরাই স্বর্ণ বিক্রির ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) আরএমপি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান আরএমপির মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) মো. গাজিউর রহমান।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতার সাত চোরের একজনকে খুলনা এবং অপর ছয়জনকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চোরাই মালামাল কেনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে স্বর্ণ ব্যবসায়ী রবিউল হাসানকে (৪৫) ঢাকার একটি এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
আরএমপি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ জুন ভোরে রাজশাহী নগরীর সাহেববাজার স্বর্ণপট্টির কারুশ্রী জুয়েলার্সে চুরির ঘটনা ঘটে। ওই সময় ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল দোকানটির সামনে এসে বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রির দোকান বসিয়ে কৌশলে জটলা তৈরি করে। একপর্যায়ে তারা পাশের একটি স্বর্ণের দোকানের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে ওই দোকানের ভেতর দিয়ে কারুশ্রী জুয়েলার্সের পশ্চিম পাশের দেয়াল কেটে দোকানটিতে ঢোকে।
এরপর সিন্দুক ও শোকেস থেকে স্বর্ণ, রূপা ও নগদ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় চোরেরা। কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক তুর্য সরকার বাদী হয়ে এ ঘটনায় বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলা করেন। মামলার বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, চোরেরা প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণ, ১ হাজার ২০০ ভরি রূপা, তিন বক্স স্বর্ণের নাকফুল এবং নগদ ২০ লাখ টাকা নিয়ে যায়।
ঘটনার পর মামলাটি সুষ্ঠু তদন্তের জন্য পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবিরের নির্দেশে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ডিবি, সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও সিসি ক্যামেরা ইউনিট যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, চক্রটির সদস্যরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে চুরি করত। তারা একটি মোবাইল ফোন একাধিকবার ব্যবহার করত না এবং ব্যবহৃত সিমকার্ডও অন্য ব্যক্তিদের নামে নিবন্ধিত থাকত। এসব সিম যাদের নামে নিবন্ধিত, তাদের অনেকেই নিজেদের নামে সিম থাকার বিষয়টি জানতেন না বলেও পুলিশ দাবি করেছে। অপরাধের পর দ্রুত স্থান পরিবর্তন করত চক্রের সদস্যরা এবং কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় দীর্ঘদিন অবস্থান করত না।
তদন্তে পুলিশ আরও জানতে পারে, চক্রটি বছরে এক থেকে দুটি বড় ধরনের চুরি করত। প্রতিটি চুরির আগে তিন থেকে চার মাস ধরে সংশ্লিষ্ট এলাকা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করত তারা। একই সঙ্গে চুরির পর নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার পথও নির্ধারণ করা হতো।
পুলিশের দাবি, কারুশ্রী জুয়েলার্সে চুরির প্রায় চার মাস আগে চক্রটির কয়েকজন সদস্য রাজশাহীতে এসে বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করেন। ব্যবসার আড়ালে তারা স্বর্ণপট্টি ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করেন এবং পরে চুরির পরিকল্পনা ও পালানোর পথ নির্ধারণ করেন।
এরপর পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে আরএমপির একাধিক দল দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শুরু করে। গত পরশু দিবাগত রাতে খুলনা থেকে বাগেরহাটের মোংলা থানার শেহলাবুনিয়া মোর্শেদ সড়ক গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে রুস্তম আলী শেখকে (৬৪) গ্রেফতার করা হয়।
এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থানার মাধবপুরা (মাইল্যারহাট) গ্রামের আ. হাকিমের ছেলে স্বপন (৬২), একই গ্রামের মানিক ফকিরের ছেলে উজ্জল (৩৭), একই থানার মাধবপুরা গ্রামের মতি ফকিরের ছেলে রিয়াজ ওরফে সুমন ওরফে সুজন ওরফে গেদু (৩৯), বাগেরহাটের শরণখোলা থানার খোন্তাকাটা (জিমতলা) গ্রামের মোসাকের ছেলে আবু তালেব (৪৫), একই থানার পূর্ব খোন্তাকাটা গ্রামের শেখ ফজলু শেখের ছেলে মো. কালাম শেখ (৪৮) এবং পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থানার মাধবপুরা (মাইল্যারহাট) গ্রামের আ. হাকিমের ছেলে ইউনুসকে (৪৫) গ্রেফতার করা হয়।
পরে পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চোরাই মালামাল কেনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে স্বর্ণ ব্যবসায়ী রবিউল হাসানকে (৪৫) ঢাকার একটি এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি চাঁদপুর জেলার কচুয়া থানার সরকার বাড়ি রজনী খোলা গ্রামের রফিজ উদ্দিনের ছেলে।
পুলিশের দাবি, রবিউল হাসানের হেফাজত থেকে চুরি যাওয়া ২৬ ভরি স্বর্ণ, ৬২ ভরি রূপা এবং চোরাই স্বর্ণ বিক্রির ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশ পাহারায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আরএমপি জানিয়েছে, চুরি যাওয়া বাকি মালামাল উদ্ধার এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে।
পুলিশের দাবি, গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে চক্রটির আরও সদস্য এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত বড় ধরনের চুরির বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরএমপি ডিবির এডিসি হাফিজুর রহমান, সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ইন্সপেক্টর সমিত কুমার কুন্ডু এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) সাব-ইন্সপেক্টর শাহ আলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।