কাজে ফিরছেন পোশাকশ্রমিকরা
গত কিছুদিন ধরে পোশাকশিল্প খাত ও রাজধানীসহ প্রধান শিল্পাঞ্চলে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের দাবির মুখে যে পরিকল্পিত অস্থিরতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল, তা নস্যাৎ করে সাধারণ পোশাকশ্রমিকেরা আবার তাঁদের কর্মস্থলে ফিরে এসেছেন। শ্রমিক আন্দোলনের ব্যানারে দেশবিরোধী চক্র ও উসকানিমূলক হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে প্রত্যাখ্যান করে উৎপাদন ও স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে শুরু করেছে তৈরি পোশাক কারখানাগুলো।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সংলগ্ন কোনাবাড়ী, চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া, মৌচাক, সফিপুর, পল্লী বিদ্যুৎ ও চন্দ্রাসহ বিভিন্ন এলাকার কারখানাগুলোতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন পোশাকশ্রমিকেরা। অধিকাংশ কারখানা খুলে দেওয়ায় শিল্পাঞ্চল জুড়েই পরিস্থিতি বর্তমানে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।
বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও মহাসড়ক ঘুরে দেখা যায়, শ্রমিকেরা সারিবদ্ধভাবে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কারখানায় প্রবেশ করছেন। এক শ্রমিক বলেন, গত কয়েক দিন কারখানায় কাজে যোগ দিতে পারি নাই। কারখানার সামনে আসার আগেই আন্দোলন দেখে চলে যেতাম। আজকে সকাল থেকে কোনো ঝামেলা বা আন্দোলন নেই, তাই শান্তিতে কারখানায় প্রবেশ করতে পারছি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণের দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন পয়েন্টে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন পোশাকশ্রমিকেরা। এ নিয়ে বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে যানবাহন, মার্কেট ও পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে অনেক শিল্পকারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং পরবর্তীতে সরকার শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। বুধবার পর্যন্ত কিছু স্থানে বিক্ষোভ থাকলেও বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত গাজীপুরের কোথাও আর নতুন করে বিক্ষোভ বা সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেনি।
শিল্পাঞ্চলের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা জোরদারে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ, আনসার ও বিজিবির ২৫ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি মাঠে কাজ করছেন ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও মোবাইল কোর্ট।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল ২-এর পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন জানান, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গাজীপুরের কোথাও কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত রয়েছে এবং শ্রমিকেরা স্বাভাবিকভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। কারখানা খুলে দেওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক টহল ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। আন্দোলন ঘিরে আজ কোনো কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়নি; প্রায় সব কারখানাতেই কাজ চলছে।
বর্তমানে অধিকাংশ কারখানা সচল হলেও নিরাপত্তার স্বার্থে হাতে গোনা কয়েকটি কারখানা এখনো বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে দ্রুতই বাকি কারখানাগুলো চালু হয়ে পুরো শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন গতি পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত কয়েকদিনে ঢাকার মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অরাজকতা, সড়ক অবরোধ ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। তবে সাধারণ শ্রমিকরা বুঝতে পেরেছেন যে, তাঁদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়ার আড়ালে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী অর্থনীতি ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল। ফলে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ পোশাকশ্রমিকরা সহিংস পথ পরিহার করে কারখানায় কাজে যোগ দেন। বিজিএমইএ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে, দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আন্দোলনকে উসকে দিয়ে সহিংসতা সৃষ্টি করতে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারা অর্থ বরাদ্দ দেয়। সড়ক ভাঙচুরের জন্য তিন হাজার টাকা এবং যানবাহনে বা সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের জন্য ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে।
মিরপুর-১০ ও ১১ নম্বরে নাশকতার অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লা। সে বিভিন্ন এলাকা থেকে বহিরাগতদের ঢাকায় এনে এই সহিংসতায় যুক্ত করে।
নাশকতার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের একাধিক নেতাকর্মীসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মোবাইল ফোনে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়াসহ একাধিক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও পাঠানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
দেশকে অস্থিতিশীল করতে এবং অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত পোশাক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সাধারণ শ্রমিকদের ছদ্মবেশে এই তাণ্ডব চালায়।
পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং সাধারণ শ্রমিক সংগঠনগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কারখানা বন্ধ রাখা বা সড়ক অবরোধের সহিংস কর্মসূচির সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের কোনো যোগসূত্র নেই। শ্রমিকরা তাদের বেতন বৃদ্ধি ও চাকরির শর্ত সংক্রান্ত দাবিগুলো মালিকপক্ষ ও সরকারের টেবিলেই সমাধানের পক্ষে। ফলে উসকানিদাতাদের ছক নস্যাৎ করে কারখানাগুলোতে উৎপাদন প্রক্রিয়া পূর্ণ শক্তিতে আবার শুরু হয়েছে।