আওয়ামী লীগকে ‘মাফিয়া শক্তি’ বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
আওয়ামী লীগকে ‘মাফিয়া শক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দলটি নিষিদ্ধ ঘোষিত। এটি প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ছিল না। দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে, তা জনগণই নির্ধারণ করবে।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় আওয়ামী লীগ নেত্রীর দেশে ফেরার সম্ভাবনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ পড়া পুলিশ কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগ, ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন, নাটোরে সংসদ সদস্যের ছেলের গ্রেপ্তার ও রিমান্ড এবং সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাওরির মৃত্যু নিয়ে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পারেন—এমন আলোচনা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “কে কখন আসতে চাচ্ছেন, সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়। সরকার দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। প্রচলিত আইন অনুযায়ীই সবার বিচার হবে।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জাতিসংঘের হিসাবে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ৪০০-এর বেশি। সরকারের হিসাবে এ সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। তাঁর দাবি, এত প্রাণহানির পরও আওয়ামী লীগ দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চায়নি। দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত জনগণই নেবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এ সময়ে গুম, ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি দাবি করেন। পুলিশের মনোবল ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি জনবল, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ পড়া পুলিশ কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, গত ২ আগস্ট ৫৮ জন বিসিএস পুলিশ কর্মকর্তাকে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২৭তম বিসিএসের ৫৭ জন এবং ২৮তম বিসিএসের একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তাঁদের প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ফল বাতিল করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুপুরের দিকে ভোট পড়ার হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়েও তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, সেখানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে।
নাটোরে ছাত্রদল নেতার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সংসদ সদস্যের ছেলেকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আইন সবার জন্য সমান। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাওরির মৃত্যুর বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর তুরাগ নদ থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত ও প্রাথমিক তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এ ঘটনায় তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ধরনের অনুমাননির্ভর মন্তব্য না করার ইঙ্গিত দেন তিনি।
পুলিশকে জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের আহ্বান : এরআগে বৃহস্পতিবার সকালে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির ঐতিহাসিক প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ও ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ)-এর ছয় মাস মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এসময় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশকে পেশাগত দক্ষতা, নিরপেক্ষতা এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, মানুষের আস্থা অর্জন এবং ন্যায়সংগতভাবে আইন প্রয়োগের মধ্য দিয়েই পুলিশকে জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের দায়িত্ব শুধু আইন প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জানমাল রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করাও পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পেশাদারত্ব, সততা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বজায় রাখতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন পুলিশের কাছে সহজে যেতে পারে এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে আস্থা রাখতে পারে, সে পরিবেশ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
নবীন পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রশিক্ষণে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে। দায়িত্ব পালনের সময় কোনো ধরনের পক্ষপাত, ব্যক্তিগত প্রভাব কিংবা অনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করা যাবে না। আইন ও বিধিবিধান মেনে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং মানবিক আচরণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক অপরাধ মোকাবিলা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। পাশাপাশি বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে শৃঙ্খলা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও পেশাগত মূল্যবোধ জোরদার করতে হবে।
পুরস্কার পেলেন আট প্রশিক্ষণার্থী : অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পরে প্রশিক্ষণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জনকারী আট প্রশিক্ষণার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন তিনি।
২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্টদের মধ্যে বেস্ট সার্জেন্ট নির্বাচিত হন মোহা. ওমর ফারুক, বেস্ট একাডেমিক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ সাইফুল ইসলাম এবং বেস্ট শুটার মোহা. আসাদুজ্জামান।
অন্যদিকে, ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টরদের মধ্যে বেস্ট ক্যাডেট নির্বাচিত হন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, বেস্ট একাডেমিক মো. বোরহানুল ইসলাম, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ দেওয়ান গোলাম রসুল এবং বেস্ট শুটার মো. কামাল গনি।
এবারের প্রশিক্ষণে মোট ২৪৬ জন অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ৮৪ জন শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট এবং ১৬২ জন ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর। ছয় মাসের মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষানবিশ সার্জেন্টরা নিজ নিজ ইউনিটে এবং ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টররা প্রবেশনারি নিরস্ত্র সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করবেন।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা, পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির অধ্যক্ষ মো. মাইনুল হাসান, রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. রেজাউল আলম সরকার এবং রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক মো. আশিক সাঈদসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, আমন্ত্রিত অতিথি, প্রশিক্ষণার্থীদের অভিভাবক এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। কুচকাওয়াজে প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন প্রবেশনারি সহকারী পুলিশ সুপার মো. মাহবুব হোসেন।