রাজশাহীতে দুই ঘণ্টা পর ফ্ল্যাটের দরজা ভাঙল ফায়ার সার্ভিস, নারীসহ সাবেক ওসি থানায়
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে একটি ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়ছিলেন এক নারী। ভেতরে তার স্বামী রয়েছেন—এমন দাবি করে বারবার দরজা খোলার অনুরোধ করলেও কোনো সাড়া মিলছিল না। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও দরজা খোলা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে দরজা ভেঙে ভেতর থেকে এক পুলিশ কর্মকর্তা ও এক নারীকে বের করে আনেন। পরে দুজনকেই নেওয়া হয় থানায়।
শুক্রবার সকালে রাজশাহী নগরীর চন্দ্রিমা থানার নাদের হাজির মোড়সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। থানায় নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব আলম। তিনি ২০২৪ সালে চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছিলেন।
ফ্ল্যাট থেকে বের করে আনার পর মাহবুব আলম দাবি করেন, ভেতরে থাকা সানজিদা মৌ তার স্ত্রী। তবে তাদের বিয়ের কাবিননামা তিনি দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের বাইরে অবস্থান নেওয়া আন্নি আক্তার নিজেকে মাহবুব আলমের ষষ্ঠ স্ত্রী বলে দাবি করেন। মাহবুবের দাবি, আন্নিকে চারদিন আগে তিনি তালাক দিয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার সকালে। নওগাঁ থেকে সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে ওই ফ্ল্যাটে আসেন আন্নি আক্তার। তার দাবি, আগের রাতে তিনি জানতে পারেন মাহবুব আলম ওই ফ্ল্যাটে এসেছেন এবং সেখানে সানজিদা মৌ রয়েছেন। এরপর তিনি এসে দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও দরজা না খোলায় ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন।
পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পরও দরজা খোলা হয়নি বলে দাবি করেন আন্নি। পরে তিনি ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তখন মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌ ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে ছিলেন। পুলিশ ফোন করে দরজা খুলতে বললেও দরজা খোলা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
পরে মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌকে থানায় নেওয়া হয়। এ সময় সাংবাদিকেরা তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। সানজিদা কোনো মন্তব্য করেননি। মাহবুব আলম বলেন, আন্নিকে তিনি তালাক দিয়েছেন এবং এ-সংক্রান্ত একটি কাগজ পুলিশের কাছে জমা দিয়েছেন। তবে সানজিদার সঙ্গে তার বিয়ের কাবিননামা তিনি দেখাতে পারেননি।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চারদিন আগে আন্নিকে তালাক দেওয়ার একটি কাগজ মাহবুব আলম দিয়েছেন। তবে আন্নি জানিয়েছেন, তিনি তালাকের কোনো কাগজ হাতে পাননি।
আন্নি আক্তার নওগাঁর বাসিন্দা। তিনি নিজেকে নারী উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে পরিচয় দেন। তার অভিযোগ, চলতি বছরের শুরুতে মাহবুব আলম তাকে বিয়ে করেন। পরে মাহবুবের একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিভিন্ন এলাকায় বিয়ের বিষয়ে জানতে পারেন বলে দাবি করেন তিনি।
আন্নির আরও দাবি, রাজশাহী নগরীর পদ্মা আবাসিক এলাকায় মাহবুব আলমের নিজস্ব একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর আগেও সেখানে সানজিদা মৌকে মাহবুবের সঙ্গে পেয়েছিলেন তিনি। তখন বিষয়টি প্রকাশ করেননি বলে জানান আন্নি।
নাদের হাজির মোড়ের যে ফ্ল্যাটে শুক্রবারের ঘটনা ঘটেছে, সেটি মাহবুব আলমের কথিত পালিত মেয়ের নামে ভাড়া নেওয়া। সেখানে তার পালিত মেয়ে ও জামাই থাকেন। তবে বৃহস্পতিবার রাত থেকে ফ্ল্যাটটিতে মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌ অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে।
মাহবুব আলমের চাকরির অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি ২০২৪ সালে চন্দ্রিমা থানার ওসি থাকাকালে এক ব্যক্তির কাছ থেকে খাম নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রত্যাহার হন। পরে নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত থাকার সময় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এরপর তাকে সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত রাখা হয়।
সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট মোস্তাক আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, মাহবুব আলমের কোনো ছুটি নেই এবং কাউকে জানিয়েও তিনি রাজশাহীতে যাননি। অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করা অপরাধ। তিনি বলেন, মাহবুব আলম ওই প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সংযুক্ত থাকলেও নওগাঁ জেলা পুলিশে কর্মরত। বিষয়টি নওগাঁ জেলা পুলিশকে জানানো হয়েছে। তারা এ বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে।
এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন আন্নি আক্তার। শুক্রবার দুপুরে অভিযোগ লেখার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তখন মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌকে থানার পৃথক দুটি কক্ষে রাখা হয়।
চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ছুটিতে থাকায় থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মাহমুদ সিদ্দিকী বলেন, মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌয়ের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা থানায় আসবেন। এরপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।