দিন শেষে শত শত চড়ুইয়ের ঠিকানা নগরীর পুলিশ ফাঁড়ির গাছে
রাজশাহী নগরীর উপশহর পুলিশ ফাঁড়ির পাশে অবস্থিত গাছে চড়ুই পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়। প্রতিদিন পড়ন্ত বিকেলে ঝাঁকে ঝাঁকে চড়ুই এসে জড়ো হয় গাছের ডালে। তাদের কিচিরমিচির, ডানা ঝাপটানো আর দলবেঁধে ওড়াউড়িতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এই গাছই এখন শত শত চড়ুই পাখির রাত্রিযাপনে আশ্রয়স্থল। প্রতিদিন বিকেল হলেই দূর-দূরান্ত থেকে দল বেঁধে উড়ে এসে গাছের ডালে বসে পাখিগুলো।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগ মুহূর্তে হঠাৎ করেই আকাশে দেখা দেয় ছোট ছোট পাখির ঝাঁক। মুহূর্তেই গাছের ডালপালা ভরে যায় চড়ুইয়ে। কেউ ডালে বসে ডাকছে, কেউ আবার এক গাছ থেকে অন্য গাছে উড়ে যাচ্ছে। কখনো দল বেঁধে আকাশে চক্কর দিচ্ছে, আবার মুহূর্তেই ফিরে আসছে আশ্রয়স্থলে।
চড়ুইদের এমন চঞ্চলতায় পুরো এলাকা যেন হয়ে ওঠে ছোট্ট এক প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য। ব্যস্ত নগরীর এই উপশহর পুলিশ ফাঁড়ির রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী পথচারীরাও অনেক সময় থমকে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন পাখিদের এই ব্যতিক্রমী দৃশ্য।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভোরের আলো ফুটতেই চড়ুইয়ের দল গাছগুলো ছেড়ে খাবারের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পড়ন্ত বিকেলে আবার ফিরে আসে এই গাছে। দিনের পর দিন একই নিয়মে ফিরে আসায় জায়গাটি যেন তাদের স্থায়ী নিরাপদ নীড় হয়ে উঠেছে।
উপশহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শাহ আলম বলেন সত্যিই রাজশাহী একটি শান্তির শহর, যে শহররে পাখিগুলো আজ নিরাপদে বসবাস করে। এখানে আমি গত বছর উপশহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। যখন প্রথমে আমি এই অফিসে আসি সেই দিন সন্ধায় অফিসের কাজে বোয়ালিয়া মডেল থানায় যাওয়ার জন্য বের হতেই চোখে পড়ে এই চড়ুই গুলোর আমার অফিসের পাশ্বে এই গাছটিতে বসে কিচিরমিচির করছে । আমি তখন থমকে দাঁড়িয়ে কিছু ক্ষণের জন্য গ্রাম-বাংলার সেই সকালের পাখির ডাক অনুভব করি। এখন তাদের সাথে আমার নিত্য দিনের দেখাশোনা ও তাদের ডাক শোনার অভ্যাসে পরিণিত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বুলবুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন বিকেলের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে চড়ুই এখানে এসে জড়ো হয়। সন্ধ্যার আগে গাছে নামার পর চারপাশ কিচিরমিচির শব্দে মুখর হয়ে ওঠে। পাখিগুলোর এমন দৃশ্য দেখতে খুব ভালো লাগে। মনে হয় শহরের মধ্যেই যেন একটি পাখির অভয়ারণ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় ছোট্ট এই পাখিটির ভূমিকা থাকলেও নানা কারণে দিন দিন তাদের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। পুরোনো গাছ কেটে ফেলা, নতুন ভবন নির্মাণ, ঝোপঝাড় কমে যাওয়া এবং খাদ্য ও বাসা বাঁধার উপযোগী জায়গা কমে যাওয়ায় চড়ুইয়ের নিরাপদ আবাসস্থলও হুমকির মুখে পড়ছে। চড়ুই শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না, পরিবেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রজননকালীন সময়ে বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় ও তাদের লার্ভা খেয়ে এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ফলে কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও পাখিটির উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।
জেলা জীব বৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিটির প্রধান সমন্বায়ক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, চড়ুই পাখি আমাদের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষের বসতির খুব কাছাকাছি থেকেও এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। মহম্মদপুরে যে জায়গাটিতে প্রতিদিন অসংখ্য চড়ুই নিরাপদ আশ্রয় নিচ্ছে, সেটি নিঃসন্দেহে প্রকৃতির জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল টিকিয়ে রাখতে গাছপালা সংরক্ষণ করতে হবে এবং কোনোভাবেই পাখি শিকার, নিধন বা তাদের বিরক্ত করা যাবে না।