রবিবার, নভেম্বর ০৮, ২০২৬
রাজশাহী
06 Nov, 2026

কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় ১৪৩ জনের নিয়োগ: রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার বরখাস্ত ঘিরে প্রশ্ন

মুহা: আবদুল আউয়াল : ২৫ জুলাই ২০২৬ ০২:১৬ অপরাহ্ন রাজশাহী
মুহা: আবদুল আউয়াল : ২৫ জুলাই ২০২৬ ০২:১৬ অপরাহ্ন
কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় ১৪৩ জনের নিয়োগ: রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার বরখাস্ত ঘিরে প্রশ্ন
ছবি সংগৃহীত

 রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১৪৩ জন জনবল নিয়োগে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগের পর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। তবে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিপত্র বলছে, পুরো নিয়োগ ও ক্রয় কার্যক্রম নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের লিখিত নির্দেশনা, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) অনুমোদন এবং মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একাধিক সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনের মাধ্যমে সম্পন্ন একটি প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেন শুধু মাঠপর্যায়ের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নথিপত্রে দেখা যায়, নিয়োগ কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্দেশনা, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ ও কেন্দ্রীয় অনুমোদন ছিল। অন্যদিকে ঘুষের অভিযোগ সামনে এলেও এখন পর্যন্ত এর পক্ষে কোনো সরকারি নথি, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য বা অন্য কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে অভিযোগের সত্যতা, দায় নির্ধারণের ভিত্তি এবং তদন্তের পরিধি নিয়েই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নথিতে যা পাওয়া গেছে : সরকারি নথি অনুযায়ী, গত ২৩ জুন নির্বাচন কমিশন সচিবালয় দেশের সব আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার জন্য আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগসংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে। একই দিনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) ই-জিপির পরিবর্তে অফলাইনে ডাইরেক্ট প্রোকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) অনুসরণের অনুমোদন দেয়। নির্দেশনায় ৩০ জুনের মধ্যে পুরো কার্যক্রম শেষ করতে বলা হয়।

পরদিন ২৪ জুন মূল্যায়ন কমিটির অনুমোদন, ২৫ জুন দরপত্র আহ্বান, ২৭ জুন মূল্যায়ন কমিটির সভা ও প্রতিবেদন এবং ২৯ জুন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অনুমোদনের পর কেএসএফ ট্রেড লিমিটেডকে কার্যাদেশ (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড) দেওয়া হয়। একই দিনে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের জন্য ৫ জন চালক, ৬৯ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং ৬৯ জন নিরাপত্তা প্রহরীসহ মোট ১৪৩ জন জনবল সরবরাহের দায়িত্ব পায় প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের পৃথক নির্দেশনায় আগে থেকেই কর্মরত আউটসোর্সিং কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। সে অনুযায়ী ১৩৭ জন কর্মরত কর্মীর তালিকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি ১৪৩ জনের চূড়ান্ত তালিকা জমা দিলে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে পর্যায়ক্রমে তারা কর্মস্থলে যোগ দেন।

অভিযোগ বনাম নথির তথ্য : সম্প্রতি একটি ইউটিউবভিত্তিক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, নিয়োগপ্রাপ্তদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে এবং কোনো লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশন সচিবালয় মো. আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু করে।

তবে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে নিয়োগ কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপের অনুমোদন, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, কার্যাদেশ ও চুক্তিপত্রের তথ্য পাওয়া গেলেও চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগের সমর্থনে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি নথি, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য বা অন্য কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। একইভাবে অভিযোগ উত্থাপনকারী ইউটিউবভিত্তিক প্রতিবেদনেও এ ধরনের কোনো যাচাইযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এখন তদন্তের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে।

এদিকে অভিযোগ তদন্তে গত ২১ জুলাই নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব (শৃঙ্খলা) সালাহউদ্দীন আহমদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) ডিএম আতিকুর রহমানকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদেশে বলা হয়েছে, রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা (সাময়িক বরখাস্তকৃত) মো. আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১৪৩ জন কর্মী নিয়োগে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তা সরেজমিন তদন্তের জন্য এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এদিকে নথিপত্রে দেখা যায়, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, মূল্যায়ন কমিটি এবং জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা ছিল। অথচ এখন পর্যন্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কেবল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ফলে তদন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তর এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা সমানভাবে মূল্যায়ন করা হবে কি না, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ২০ জুলাই জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী জনস্বার্থে মো. আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিভাগীয় কার্যক্রম চলাকালে তিনি বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন।

কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা : চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নির্বাচন অফিসে কর্মরত আউটসোর্সিং চালক ইসমাইল হোসেন বলেন, তিনি ২০১৬ সাল থেকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মরত রয়েছেন। চলতি বছরের জুলাই মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যোগদানপত্র সংগ্রহ করেছেন। এ প্রক্রিয়ায় তার কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি এবং কেউ টাকাও দাবি করেনি।

বোয়ালিয়া থানা নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ফারুক হোসেন বলেন, তিনি ২০২৩ সালে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেন। ২০২৫ সালের নীতিমালায় অভিজ্ঞ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান অনুযায়ী পুনরায় নিয়োগ পেয়েছেন। এ নিয়োগেও তার কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি।

রাজপাড়া থানা নির্বাচন অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সাব্বির হোসেন বলেন, নতুন কাউকে নিয়োগ না দিয়ে আগের কর্মীদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তার ক্ষেত্রেও কোনো অর্থ লেনদেন হয়নি।

কেএসএফ ট্রেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামীম হোসাইন বলেন, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা ও কেন্দ্রীয় অনুমোদনের ভিত্তিতেই আগের কর্মীদের বহাল রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্বভাবে কোনো তালিকা তৈরি করেনি; নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তালিকা অনুযায়ীই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রতিষ্ঠানের অগোচরে কেউ ব্যক্তিগতভাবে অর্থ নিয়ে থাকলে তার দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না।

রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, সরকার নির্ধারিত নীতিমালা ও বিধিবিধান অনুসরণ করেই পুরো নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটেনি।

তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে যে প্রশ্ন : তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন তিনটি বিষয় সামনে এসেছে—নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ও অনুমোদনের ভূমিকা, ঘুষের অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ রয়েছে কি না এবং দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা সমানভাবে মূল্যায়ন করা হবে কি না। 

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের ভাষ্য, পুরো প্রক্রিয়াটি যেহেতু একাধিক স্তরের সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে, তাই তদন্তেও প্রতিটি স্তরের সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অন্যথায় বহুস্তরের অনুমোদনে সম্পন্ন একটি প্রক্রিয়ার দায় কেবল একজন কর্মকর্তার ওপরই বর্তানোর প্রশ্ন থেকেই যাবে।