জিআই স্বীকৃত রাজশাহীর মোহনপুরের পান পেল স্থায়ী প্রতীক
জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এবার রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পান পেল স্থায়ী ও দৃশ্যমান পরিচয়ের প্রতীক। মোহনপুর উপজেলার প্রবেশমুখে নির্মিত হয়েছে পানের প্রতীকসংবলিত একটি সীমানা পিলার। স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক সীমানা নির্দেশ করবে না; বরং উপজেলার কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং ব্র্যান্ড পরিচিতিকে আরো সুসংহত করবে।
সোমবার (২০ জুলাই) সকালে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের পাশে উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের বসন্তকেদার এলাকায় নির্মিত সীমানা পিলারের ফলক উন্মোচন করেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম।
উদ্বোধন শেষে জেলা প্রশাসক বলেন, "প্রতিটি উপজেলার প্রবেশমুখে তার নিজস্ব পরিচয় বহনকারী একটি সীমানা পিলার থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটিয়ে আজ মোহনপুরের এই সীমানা পিলারের উদ্বোধন করা হলো। জিআই স্বীকৃত মোহনপুরের পান এ উপজেলার ঐতিহ্য, অর্থনীতি ও স্বাতন্ত্র্যের অন্যতম প্রতীক। তাই সীমানা পিলারে পানের প্রতীক সংযোজনের মাধ্যমে মোহনপুরের নিজস্ব পরিচয়কে স্থায়ীভাবে তুলে ধরা হয়েছে।"
তিনি জানান, সীমানা পিলারের পাশে 'এক নজরে মোহনপুর' শিরোনামে একটি তথ্যফলক স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে। এতে উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষি, দর্শনীয় স্থান ও সম্ভাবনার তথ্য থাকবে, যা দর্শনার্থীদের জন্য তথ্যসমৃদ্ধ একটি পরিচিতি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
ঐতিহ্যকে দৃশ্যমান করার উদ্যোগ : স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে সীমানা পিলারটি নির্মাণ করা হয়েছে। বাস্তবায়ন করেছে মোহনপুর উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর।
মোহনপুরের প্রধান অর্থকরী কৃষিপণ্যগুলোর মধ্যে পান অন্যতম। কয়েক দশক ধরে এখানকার পান দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে এবং এর স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে আলাদা সুনাম অর্জন করেছে। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর সেই ঐতিহ্যকে স্থায়ীভাবে তুলে ধরতেই সীমানা পিলারের শীর্ষে পানের প্রতীক সংযোজন করা হয়েছে।
কৃষি ও ব্র্যান্ডিংয়ের নতুন মাত্রা : উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম বলেন, "মোহনপুরের পরিচয়ই হলো পান। তাই উপজেলার প্রবেশমুখে পানের প্রতীক সংযোজনের মাধ্যমে সেই পরিচয়কে দৃশ্যমান করা হয়েছে। এটি শুধু একটি অবকাঠামো নয়, বরং মোহনপুরের কৃষি ঐতিহ্য ও ব্র্যান্ড পরিচয়ের প্রতীক। ভবিষ্যতেও জনবান্ধব ও পরিচয়ভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা থাকবে।"
মৌগাছি ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মেজর আলী বিশ্বাস বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর দাবি ছিল এমন একটি সীমানা পিলার নির্মাণের। নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। অবশেষে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। পানের প্রতীক সংযোজনের মাধ্যমে মোহনপুরের স্বাতন্ত্র্য আরো সুস্পষ্ট হলো।"
বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোর্তজা বলেন, "এটি শুধু একটি সীমানা পিলার নয়, আমাদের ইতিহাস ও গৌরবের প্রতীক। নতুন প্রজন্ম এই প্রতীক দেখে নিজেদের এলাকার ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে এবং গর্ববোধ করবে।"
পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের আশা : সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সময়ে কোনো এলাকার পরিচিতি গড়ে তুলতে প্রতীকী স্থাপনার গুরুত্ব অনেক। বিশেষ করে জিআই পণ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতীক স্থানীয় ব্র্যান্ডিংকে শক্তিশালী করে, যা পর্যটন আকর্ষণ বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
মোহনপুরের পান হাজারো কৃষকের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। তাই এই প্রতীকী স্থাপনা শুধু একটি অবকাঠামো নয়; বরং কৃষক, ঐতিহ্য ও স্থানীয় অর্থনীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরও একটি দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিমা বিনতে আখতার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) জোবায়দা সুলতানা, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম, মৌগাছি ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মেজর আলী বিশ্বাস, বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিরা।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, জিআই স্বীকৃত মোহনপুরের পানের প্রতীক বহনকারী এই সীমানা পিলার উপজেলার ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে মোহনপুরের পরিচিতি, কৃষিভিত্তিক ব্র্যান্ডিং এবং পর্যটন সম্ভাবনা বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।