রবিবার, নভেম্বর ০৮, ২০২৬
রাজশাহী
31 Oct, 2026

নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের চেষ্টা অব্যাহত

মুহা: আব্দুল আউয়াল : ১৯ জুলাই ২০২৬ ০২:৫৩ পূর্বাহ্ন রাজশাহী
মুহা: আব্দুল আউয়াল : ১৯ জুলাই ২০২৬ ০২:৫৩ পূর্বাহ্ন
নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের চেষ্টা অব্যাহত
ছবি সংগৃহীত

কয়েক মাস আগে তীব্র সমালোচনা ও জনমতের চাপে থমকে যাওয়া নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো)-এর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের উদ্যোগ আবারো সক্রিয় হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ এবার প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিশ্লেষণের নির্দেশ দিয়ে নতুন চিঠি জারি করেছে। চিঠিটি প্রকাশ্যে আসার পর রাজশাহীতে আবারো শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—এটি কি কেবল একটি সম্ভাব্যতা যাচাই, নাকি প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের প্রক্রিয়া আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল?

বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখা থেকে গত ১৬ জুলাই সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ মেজবাহ উল সাবেরিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের আগে এর আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে স্থানান্তরের ফলে সম্ভাব্য সব ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করে মতামত দিতে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

পুরনো উদ্যোগ, নতুন গতি : এটি প্রথম কোনো উদ্যোগ নয়। এর আগে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর কাছে একটি আধাসরকারি (ডিও) চিঠি পাঠান। সেই চিঠির ভিত্তিতেই গত মার্চে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

তবে বিষয়টি জনসমক্ষে আসার পর রাজশাহীতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় সমালোচনা, বিভিন্ন মহলে ওঠে প্রতিবাদের সুর। এরপর কয়েক মাস এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকলেও ১৬ জুলাইয়ের নতুন চিঠি আবারো পুরো বিষয়টিকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

ডিও লেটারে কী বলা হয়েছিল : প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম তার ডিও লেটারে উল্লেখ করেন, নেসকোর কার্যক্রম উত্তরের পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমের চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পূর্ব-দক্ষিণের পাবনা পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতে থাকায় বিশেষ করে রংপুর বিভাগের অপারেশনাল অনেক কাজ সময়মতো সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে নেসকোর সার্বিক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি আরো বলেন, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকা বগুড়ায় প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হলে অপারেশনাল কার্যক্রম আরো গতিশীল হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, ব্যয় সাশ্রয়, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গ্রাহকসেবার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে বলেও তিনি মত দেন। এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান তিনি।

জানা গেছে, সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসন থেকে নির্বাচিত হওয়ার পরই মীর শাহে আলম এ উদ্যোগ নেন।

কমিটি গঠনের পটভূমি : ডিও লেটারে ২৫ ফেব্রুয়ারির তারিখ রয়েছে। পরে ১ মার্চ বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবের দফতরে সেটি গ্রহণ করা হয়। এর দুই দিন পর, ৩ মার্চ বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখার তৎকালীন উপসচিব ফারজানা খানম সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করেন।

কমিটির আহ্বায়ক করা হয় বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (সমন্বয় অনুবিভাগ) মোহাম্মদ সানাউল হককে। সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) একজন প্রতিনিধিকে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

কী বলেছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা : কমিটি গঠনের সময় বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখার তৎকালীন উপসচিব ফারজানা খানম বলেছিলেন, "একটি ডিও লেটারের প্রেক্ষিতে নির্দেশিত হয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। এখানে আমার কিছুই করার নেই।"

তিনি আরো বলেছিলেন, "কমিটি এক মাসের মধ্যে বিষয়টি পর্যালোচনা করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"

এখন কী বলছে নেসকো : নতুন চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান বলেন, "চিঠি পেয়েছি। এখন ঢাকায় যাচ্ছি। রাজশাহীতে ফিরে বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে তারপর মতামত দেব।"

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "এ ব্যাপারে আমার কিছুই করার নেই। আমি চাকরি করি। আমাকে যেভাবে বলা হবে, সেভাবেই কাজ করতে হবে।"

নতুন করে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে : ১৬ জুলাইয়ের চিঠি শুধু একটি প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি উদ্যোগকে আবারো সক্রিয় করার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের আগে আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিশ্লেষণের নির্দেশ দেওয়াকে অনেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করছেন।

অন্যদিকে, রাজশাহীর ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে এর প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব কী হবে, সে বিষয়ে কি সব অংশীজনের মতামত নেওয়া হবে? নতুন চিঠির পর সেই প্রশ্ন আবারো জোরালো হয়ে উঠেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ভূমিমন্ত্রী ও রাজশাহী-২ সদর আসনের এমপি মো: মিজানুর রহমান মিনু বলেন, নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতে আছে এবং রাজশাহীতেই থাকবে। এটি রাজশাহীবাসীর দাবি। 

জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ মামুন বলেন, ‘নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতেই থাকা উচিত। উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বিবেচনায় এটি রাজশাহীতেই বহাল থাকবে বলে আমরা আশাবাদী। আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন।’

নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের নতুন উদ্যোগের বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরীর সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মণ্ডলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তবে এ উদ্যোগের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, নেসকোর প্রধান কার্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই রাজশাহীতে রয়েছে। তাই কোনো বিশেষ এলাকার স্বার্থ বিবেচনায় বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে প্রধান কার্যালয় অন্যত্র স্থানান্তরের উদ্যোগ যৌক্তিক হবে না।

তিনি আরো বলেন, নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতেই বহাল রাখা উচিত। এ ধরনের উদ্যোগ উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা ও স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি তিনি অবিলম্বে এ উদ্যোগ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসেন আলী বলেন, এর আগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতেই বহাল রাখা এবং বগুড়ায় একটি সাব-অফিস স্থাপনের বিষয়ে কথা হয়েছিল। এ বিষয়ে চেম্বারের পক্ষ থেকে লিখিতভাবেও মতামত জানানো হয়েছিল।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতেই থাকতে হবে—এটাই আমাদের সুস্পষ্ট দাবি। প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের নতুন উদ্যোগের বিষয়ে আমরা আবারও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব এবং রাজশাহীর স্বার্থ রক্ষায় আমাদের অবস্থান তুলে ধরব।

এ উদ্যোগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাত খান বলেন, নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের কোনো সিদ্ধান্ত রাজশাহীবাসী মেনে নেবে না। এমন উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা হলে সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

তিনি আরো বলেন, অতীতেও বিএনপি সরকারের আমলে রাজশাহী থেকে পিডিবির কার্যালয় বগুড়ায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজশাহীবাসীর ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের মুখে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এবারো রাজশাহীর স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে সফল হবে না।