অর্গানোগ্রাম ছাড়া চার দশক : কাঠামোগত সংকটে বিএমডিএ
উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ ও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থাপনায় চার দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, জলাধার নির্মাণ, পুকুর খনন, খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ এবং জলবায়ু সহনশীল বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। কিন্তু কার্যক্রম ও প্রকল্পের পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও প্রতিষ্ঠানটির জন্য এখনো গড়ে ওঠেনি একটি পূর্ণাঙ্গ ও অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম (সাংগঠনিক কাঠামো)। ফলে জনবল ব্যবস্থাপনা, পদায়ন, পদোন্নতি, নিয়োগ, দায়িত্ব বণ্টন ও বেতন-ভাতায় দীর্ঘদিন ধরে চলছে অসঙ্গতি ও বৈষম্য। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রয়োজনভিত্তিক জনবল কাঠামো, নিয়োগ বিধিমালা ও পদোন্নতি নীতিমালার অভাবে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রম যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত অগ্রগতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতাও।
বিএমডিএ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার শুরুতে সীমিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে জনবল কাঠামো ছিল, সময়ের সঙ্গে সংস্থাটির কাজ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেলেও সে অনুযায়ী স্থায়ী পদ ও প্রয়োজনভিত্তিক জনবল সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক কিংবা প্রকল্পভিত্তিক জনবলের ওপর নির্ভর করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম না থাকায় নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দায়িত্ব বণ্টন ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে নানা জটিলতা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে বিএমডিএর ১২৫ জন কর্মকর্তার মধ্যে প্রায় ৯৫ জনই বিভিন্ন পদে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। বছরের পর বছর এভাবে দায়িত্ব পালন করলেও তারা সংশ্লিষ্ট পদে নিয়মিত পদোন্নতি কিংবা প্রাপ্য বেতন গ্রেড পাচ্ছেন না। এমনকি প্রকল্প পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী অনেক কর্মকর্তাও নিজ মূল পদের বেতন-ভাতাই গ্রহণ করছেন।
সূত্র আরো জানায়, বিএমডিএতে সর্বশেষ নিয়োগ হয়েছে ২০০৩ ও ২০০৮ সালে। একসময় যেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ২৫০ জন, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭০৩ জনে। জনবল সংকট মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটিকে আউটসোর্সিং ও অস্থায়ী নিয়োগের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত জনবল ছিল ১ হাজার ৯১১ জন। কিন্তু মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছে মাত্র ৬৫০টি পদ। ফলে বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে অনুমোদিত জনবল কাঠামোর ব্যাপক অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্গানোগ্রামই হলো তার সাংগঠনিক ভিত্তি। এর মাধ্যমে কোন পদে কতজন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকবেন, দায়িত্ব কী হবে, পদোন্নতির ধাপ কেমন হবে এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব বিষয় নির্ধারিত হয়। অর্গানোগ্রাম না থাকলে প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি-নির্ভর হয়ে পড়ে। এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়, দক্ষতা কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনার মতো নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএমডিএর ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু নতুন পদ সৃষ্টি নয়, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, পানি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তা এবং গবেষণা সংশ্লিষ্ট পদ অন্তর্ভুক্ত করে একটি যুগোপযোগী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে যেমন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্ষমতা বাড়বে, তেমনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত নিরাপত্তা, কর্মোদ্দীপনা ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হবে।
বিএমডিএ সংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, দীর্ঘ সময়ে যারা প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে ছিলেন, তারা অর্গানোগ্রাম অনুমোদনের বিষয়ে কতটা আন্তরিক ছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সূত্রটির অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই একটি প্রভাবশালী পক্ষ রয়েছে, যারা অর্গানোগ্রাম বাস্তবায়নে আগ্রহী নয়। ফলে বছরের পর বছর বিষয়টি ঝুলে রয়েছে। বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক আবু সাঈদ মো. কামরুজ্জামান বলেন, "বিষয়টি নিয়ে আমি আন্তরিকভাবে কাজ করছি। আজও মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে কথা বলেছি। শুনেছি, একটি পক্ষ রয়েছে যারা অর্গানোগ্রাম হতে চায় না। কিন্তু এটি বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। আমি বিষয়টি এগিয়ে নিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।"
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, দীর্ঘদিনের এই কাঠামোগত সংকট নিরসনে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ ও যুগোপযোগী অর্গানোগ্রাম, নিয়োগ বিধিমালা এবং পদোন্নতি নীতিমালা অনুমোদন করতে হবে। অন্যথায় উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় চার দশক ধরে উত্তরাঞ্চলের কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা একটি প্রতিষ্ঠানের এখনো অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামো না থাকা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতাই নয়, প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনারও বড় ঘাটতির প্রতিফলন। সময়ের চাহিদা পূরণে বিএমডিএকে আরো কার্যকর, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হলে দ্রুত অর্গানোগ্রাম অনুমোদনের বিকল্প নেই।