আসছে সমন্বিত ‘ফ্যামিলি ট্রি’, এক কার্ডেই সব সুবিধা
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আমূল পরিবর্তন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এবার সমন্বিত ‘ফ্যামিলি ট্রি’ নামে একটি নেটওয়ার্কিং সিস্টেম চালুর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করছে সরকার।
এর মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সব ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হবে। অর্থ্যাৎ একই ব্যক্তি বা পরিবারে ভিন্ন ভিন্ন ভাতা পাওয়ার দ্বৈততা (ডাবল বুকিং) বন্ধ হবে। পাশাপাশি প্রকৃত অভাবী ব্যক্তির কাছে রাষ্ট্রীয় সুবিধা পৌঁছে যাবে।
প্রস্তাবিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নাম- ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক তথ্যভাণ্ডার। এটি চালু হলে মাত্র একটি কার্ড ও কিউআর কোডের মাধ্যমেই প্রান্তিক মানুষেরা সব ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা সেবা পাবেন।
সচিবালয়ে নিজ দফতরে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সরকারের এই নতুন পরিকল্পনা ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন। এছাড়াও বর্তমান সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’- এর অগ্রগতি, মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ মহাপরিকল্পনার নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন তিনি।
আগামী জুনের মধ্যে ৮০ হাজার মানুষকে ফ্যামিলি কার্ড দেয়ার লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মূলত ফেজ বাই ফেজ বা পর্যায়ক্রমে গ্রাজুয়ালি অগ্রসর হচ্ছি। এই কার্ডের পাইলটিং কার্যক্রম আগামী জুনের মধ্যে শেষ হবে। পাইলটিং মূলত করাই হয় ট্রায়াল অ্যান্ড এরর-এর জন্য। যেন মাঠ পর্যায়ের ছোটখাটো ভুল-ত্রুটিগুলো আইডেন্টিফাই করে সেগুলোর স্থায়ী সমাধান করা যায়।’
কার্ড বিতরণে প্রান্তিক মানুষের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথমত যারা বেনিফিশিয়ারি, তারা এই কার্ড পেয়ে খুবই খুশি হয়েছেন। তবে যেহেতু আমরা একটি একটি ওয়ার্ড করে দিচ্ছি, তাই পার্শ্ববর্তী অনান্য ওয়ার্ড, ইউনিয়ন বা উপজেলার মানুষের মধ্যেও তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। তাদেরও মনে হচ্ছে, এ সুবিধা কখন পাবেন! এই ব্যাপক চাহিদাই বলে দিচ্ছে, আমরা যে উদ্দেশ্যে এই ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রামটি নিয়েছি, তা সফলভাবে লক্ষ্য পূরণ করছে। সরকার গঠনের শুরুতেই এটি হাতে নেয়ায় প্রমাণিত হয়েছে, আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিক ও দায়বদ্ধ।’
তিনি আরো জানান, এ কর্মসূচির প্রধান কাজ হচ্ছে উপকারভোগীদের কাছে ঠিকমতো টাকা পৌঁছানো। অর্থাৎ যার টাকা সে যেন সরাসরি পায়। এটি নিশ্চিত করতে প্রতিদিন ডেটা ফাইন্ডিং করা হচ্ছে। গত ১৬ মে চাঁদপুর থেকে এই কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে আরো ২০টি ওয়ার্ডে এই কার্ড চালু করা হয়।
ফারজানা শারমীন আরো জানান, আগামী জুনে তৃতীয় ধাপে আরো ১৮টি উপজেলায় এ কর্মসূচি শুরু করা হবে। এসব এলাকায় মাঠ পর্যায় থেকে সুবিধাভোগী নির্বাচন করে কার্ড বিতরণ করা হবে। ইউরোপ বা আমেরিকার আদলে বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সোশ্যাল কার্ড’ ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।বাংলাদেশ ভ্রমণ
তিনি বলেন, এরই অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি ট্রি’ নামের একটি পারিবারিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। ফলে একটি একক ডিজিটাল আইডির অধীনেই জানা যাবে কোন কোন পরিবার রাষ্ট্র থেকে কী কী সুবিধা পাচ্ছে। এতে করে এক ব্যক্তি একসাথে দু’টি ভাতা নিতে পারবেন না। তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রয়োজনীয় কার্ড বা প্রতিবন্ধী ভাতা সচল থাকবে।’
তিনি আরো জানান, ফ্যামিলি কার্ডের মাসিক ভাতা দুই হাজার ৫০০ টাকা। তবে যারা বর্তমানে ৫০০ বা ১০০০ টাকার বয়স্ক বা বিধবা ভাতা পাচ্ছেন, তারা নতুন এই কার্ড নিতে চাইলে আগের ভাতাটি সারেন্ডার বা ত্যাগ করতে হবে।
ভবিষ্যতে কৃষক ও হেলথ কার্ডসহ সকল সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড একীভূত করার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এজন্য একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। সামাজিক বাস্তবতায় একই পরিবারে কৃষক, গর্ভবতী মা কিংবা বিধবা থাকতে পারেন। ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার সময় যদি দেখা যায়, উপযুক্ত নারীটি ইতোমধ্যে বিধবা বা বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন, তবে ডাবল বুকিং বন্ধের নিয়ম অনুযায়ী তাকে আগের কম অঙ্কের কার্ডটি সারেন্ডার করতে হবে। তবে তার স্বামী যদি কৃষক কার্ড নেন বা অন্য কেউ প্রতিবন্ধী ভাতা পান, তাহলে তা সচল থাকবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সকল মন্ত্রণালয় মিলে এমন একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চাই, যাতে এক ক্লিকে বা একটি কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে উপকারভোগীর সমস্ত তথ্য চলে আসে এবং ডেটাবেজটি সরাসরি এনআইডি যুক্ত থাকে। এটি করতে পারলে ভাতা নিয়ে যেসব বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়- বিশেষ করে একজনের নামের কার্ডের টাকা অন্যজনের অ্যাকাউন্টে চলে যায়, সেই অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হবে।
কার্ড দেয়ার ক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী জানান, এটি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ বা পিএমটি মেথডে করা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, এই পদ্ধতিতে আবেদনকারীর জীবনযাত্রার মান, ঘরে টেলিভিশন বা ফ্রিজ আছে কিনা কিংবা বাড়ির ছাদের অবস্থা কেমন- এমন নানা সূচকে স্কোরিং করা হয়। স্কোর ৮১৪-এর নিচে থাকা ‘অতি দরিদ্র’ পরিবারগুলোই কেবল এই কার্ডের জন্য নির্বাচিত হবে।’
ফারজানা শারমীন বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার হলো প্রান্তিক নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। এই ফ্যামিলি কার্ডের মূল লক্ষ্যই গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দিয়ে তাদের সক্ষমতা বাড়ানো।’ ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে মাঠপর্যায়ের কিছু বিচ্ছিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘পাইলটিংয়ের উদ্দেশ্যই হলো সমস্যাগুলো খুঁজে বের করা। যেখানেই অনিয়ম বা কার্ডের নামে টাকা নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, দ্রুত সেখানে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি। সম্প্রতি উত্তরাঞ্চলে একজনকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। সরকার ও উপকারভোগীর মাঝখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী সহ্য করা হবে না। এ বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল রয়েছি।’
সূত্র : বাসস