আন্তর্জাতিক নার্সেস ডে: সেবার নীরব শক্তি
প্রতি বছর ১২ মে আন্তর্জাতিক নার্সেস ডে পালিত হয় মানবসেবায় নিয়োজিত নার্সদের অবদানকে সম্মান জানাতে। আধুনিক নার্সিংয়ের পথিকৃৎ ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের জন্মদিনকে কেন্দ্র করে উদযাপিত এই দিনটি আজ শুধু একটি পেশার স্বীকৃতি নয়; বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিকে নতুন করে মূল্যায়নের উপলক্ষ।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বাস্তবতায় একজন নার্স মানে শুধু চিকিৎসকের সহকারী নন, বরং রোগীর সবচেয়ে কাছের মানুষ। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া একজন অসুস্থ মানুষ যখন শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় পার করেন, তখন একজন নার্সই হয়ে ওঠেন তার সাহস, ভরসা ও মানবিক আশ্রয়।
করোনা মহামারি বিশ্বকে শিখিয়েছে—একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি কোথায়। বাংলাদেশেও সেই কঠিন সময়ে হাজারো নার্স জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থেকে, সীমিত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিয়েও তারা রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আইসিইউ, জরুরি বিভাগ কিংবা আইসোলেশন ইউনিট—সবখানেই নার্সদের ত্যাগ ও পেশাদারিত্ব ছিল অনন্য। অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন, কেউ কেউ প্রাণও হারিয়েছেন। তবুও মানবসেবার দায়িত্ব থেকে তারা সরে দাঁড়াননি।
বর্তমানে বাংলাদেশের নার্সিং পেশা সম্ভাবনার পাশাপাশি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দেশের জনসংখ্যার তুলনায় দক্ষ নার্সের সংখ্যা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় কম। অনেক হাসপাতালে একজন নার্সকে অতিরিক্ত রোগীর দায়িত্ব নিতে হয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মানসিক চাপ, সীমিত বিশ্রাম ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও তারা দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ নার্সদের কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর হামলা কিংবা অপমানজনক আচরণের ঘটনাও উদ্বেগজনক। অথচ একজন নার্সের কাজ কেবল ওষুধ প্রয়োগ নয়; বরং রোগীর মনোবল ধরে রাখা, জরুরি মুহূর্তে সিদ্ধান্তে সহায়তা করা এবং মানবিক আচরণের মাধ্যমে রোগীর সুস্থতার পথ সহজ করা। স্বাস্থ্যসেবাকে মানবিক ও কার্যকর করতে নার্সদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের নার্সরা প্রতিনিয়ত মানবিকতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শহরের আধুনিক হাসপাতাল পর্যন্ত অনেক নার্স নিজেদের দায়িত্বের বাইরেও অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়ান। কখনও রক্তদাতা খুঁজে দেন, কখনও দরিদ্র রোগীর ওষুধের ব্যবস্থা করেন, আবার কখনও স্বজনহীন রোগীর শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠেন। এসব নীরব মানবিক কাজ সমাজকে আরও মানবিক করে তোলে।
বর্তমান বিশ্বে নার্সিং একটি আধুনিক, দক্ষতা-নির্ভর ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মানের নার্সিং শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি। দক্ষ ও মানবিক নার্স তৈরিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকার ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক নার্সেস ডে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাস্থ্যখাতের প্রকৃত শক্তি কেবল অবকাঠামো নয়, বরং মানবিক ও দক্ষ জনশক্তি। আর সেই শক্তির অন্যতম বড় ভিত্তি হচ্ছেন নার্স'রা। মানবতার এই নীরব যোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। মানবিক পেশার অনির্বাণ নক্ষত্র ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের উত্তরসূরীদের জন্য শুভকামনা নিরন্তর।
লেখক: কৃষিবিদ মনিরুজ্জামান, উদ্যোক্তা, মমতা নার্সিং ইনস্টিটিউট, রাজশাহী।
(প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব)।