"তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পদ্মা ব্যারেজ দ্রুত নির্মাণের দাবি"
রাজশাহীতে আয়োজিত এক মানববন্ধন ও সমাবেশে রাজশাহী অঞ্চলকে মরুকরণের হাত থেকে রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পদ্মা ব্যারেজ দ্রুত নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার নিশ্চিত, অবিলম্বে উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং রাজশাহীর পদ্মা নদী ক্যাপিটাল ট্রেজিংয়ের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা, কৃষি ও কৃষককে বাঁচানোর জোর দাবি জানানো হয়।
বুধবার দুপুরের দিকে রাজশাহী নগরীর সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন ও সমাবেশ থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সামাজিক সংগঠন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সহযোগিতায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) রাজশাহী কমিটি মানববন্ধনের আয়োজন করে। এতে রাজশাহীর পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। কর্মসূচি থেকে অবিলম্বে বৃহত্তর রাজশাহীর উন্নয়নে পদ্মা ব্যারেজ দ্রুত নির্মাণের দাবি জানানো হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের অনেক নারীকে প্রতিদিন বালতি বালতি খাওয়ার পানির জন্য মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়। যা এ জনপদের হাজার হাজার মানুষের প্রাত্যহিক যন্ত্রণার চিত্র। উত্তরের জেলা নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যে হারে নিচে নামছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়; বরং এক ভয়াবহ মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা।
বক্তারা বলেন, গত এক দশকে একাধিক সরকার এখানে নানা প্রকল্প নিলেও তার সুফল মিলছে না। সমাবেশ থেকে বক্তারা বলেন, নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠের জনসভায় পদ্মা ব্যারেজ দ্রুত নির্মাণের অঙ্গিকার করেছিলেন। এতে রাজশাহীর মানুষ আশায় বুক বেধেছে। এখন এর বাস্তাবায়ন চান। বক্তারা বলেন, এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন আছে। এখন বাস্তবায়ন সময়ের ব্যাপার। তাই অবিলম্বে এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
বাপা, রাজশাহীর সভাপতি মাহমুদ হাসানের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাপা‘র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান, বাপা‘র রাজশাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক সেলিনা বেগম, রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি মো. লিয়াকত আলী, দৈনিক সোনার দেশ পত্রিকার সম্পাদক হাসান মিল্লাত, বাপা রাজশাহীর সহসভাপতি জুয়েল কিবরিয়া, বাপা, পবার সভাপতি রহিমা বেগম, রুলফাও এর নির্বাহী পরিচালক আফজাল হোসেন প্রমুখ। সভায় বক্তারা বলেন, সম্প্রতি সরকার এই অঞ্চলের ৩ হাজার ৫৯৩টি মৌজাকে ‘পানিসংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে বিধিনিষেধ, নতুন নলকূপ স্থাপনে বাধা এবং পানি নির্ভর ফসল চাষ কমিয়ে আনার মতো একগুচ্ছ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কাগজ-কলমে এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
বক্তারা আরো বলেন, ভারতের সাথে ফারাক্কা চুক্তির মেয়াদ শেষ পর্যায়ে হলেও নতুন চুক্তির বিষয়ে সরকারের পক্ষ হতে এখনো দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। সমাবেশে বক্তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দাবি করেন, উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও মানুষকে বাঁচাতে পানি ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধানের জন্য “পদ্মা ব্যারেজ” প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে, “উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প”-এর মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, পদ্মা নদী ড্রেজিং করতঃ নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে, নদী কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক জোন তৈরি করতে হবে এবং ফারাক্কা চুক্তির মেয়াদ স্থায়ীভাবে সমাধান করতে হবে।
সমাবেশে রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান সম্প্রতি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা অবহেলায় শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে দোষিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান।
তিনি বলেন, রাজশাহী মেডিকেলের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রাজশাহী মেডিকেলের অব্যবস্থাপনা নিয়ে আগেও আন্দোলন হয়েছে। এখানে মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত না হলে রাজশাহীবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আবারো তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
মানববন্ধন থেকে রাজশাহী ও নাটোর জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত বড়াল নদীর উৎস মুখ থেকে পাবনার আটঘরিয়ার রেগুলেটর পর্যন্ত ৪৬ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার অংশ খনন কাজ সম্পন্নের পাশাপাশি হোজা, বারনই ও বড়ালসহ এ অঞ্চলের নদী-খাল-বিল দখল ও দুষণমুক্ত করে পুনখনন করার জোর দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, "বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও রাজশাহীর পদ্মা নদীসহ দেশের অন্যান্য নদীগুলো আজ মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। খরা মৌসুমে পদ্মায় পানি থাকে না, নদীগুলো চরে পরিণত হচ্ছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে সেচ ব্যবস্থায় কৃষকদের চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় নদীখেকোরা অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।"
বক্তারা আরো বলেন, "বরেন্দ্র অঞ্চলের তৃষ্ণার্ত মানুষের হাহাকার বন্ধ করতে চাইলে দৃশ্যমান ও টেকসই সমাধানের ব্যবস্থা নিতে হবে। পানি ছাড়া জীবন ও প্রকৃতি—উভয়ই অচল। এই সংকট মোকাবেলায় দেরি করার অর্থ হলো একটি বিশাল জনপদকে স্থায়ী বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া। পদ্মা নদী বাঁচলেই রাজশাহী বাঁচবে। ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে অবিলম্বে উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
এছাড়া বক্তারা রাজশাহীর চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "রাজশাহী শিক্ষা নগরী, শান্তির নগরী, পরিচ্ছন্ন নগরী এবং সুচিকিৎসার নগরী হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে ৫৩ জন শিশু অকালে প্রাণ হারিয়েছে।" চিকিৎসাসেবা প্রদানে যাদের গাফিলতি রয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক ও কঠিন শাস্তির দাবি জানান তারা।