শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬
কৃষি
15 Apr, 2026

রাজশাহীতে অতিবৃষ্টিতে ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকার ক্ষেতের ফসল নষ্ট

WP Import ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ০১:১৭ পূর্বাহ্ন কৃষি
WP Import ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ০১:১৭ পূর্বাহ্ন
রাজশাহীতে অতিবৃষ্টিতে ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকার ক্ষেতের ফসল নষ্ট
রাজশাহীতে অতিবৃষ্টিতে ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকার ক্ষেতের ফসল নষ্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীতে অতিবৃষ্টিতে ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকার ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৪ হাজার দুইশো কৃষক। এই বিপুল ক্ষতি কিভাবে কাটিয়ে উঠবেন তা নিয়ে কৃষকের চোখে মুখে হতাশার ছাপ ফুটে উঠেছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, নভেম্বরের শুরুতে অসময়ের দুই দিনের বৃষ্টিতে রাজশাহী জেলার ৪ হাজার ২০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) দিবাগত রাত থেকে শনিবার (১ নভেম্বর) সকাল পর্যন্ত রাজশাহী জেলায় প্রায় ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এই দুই দিনে বৃষ্টিতে জেলার ২ হাজার ১৫০ বিঘা ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অতিবৃষ্টিতে ক্ষতির বিষয়ে জানতে কথা হয় রাজশাহীর পবা উপজেলার শিয়ালবেড় গ্রামের কৃষক রাব্বানী মন্ডলের সাথে। তার চোখের কোণে অশ্রু, পায়ের নিচে হাঁটুসমান পানি। বলেন, একসময় যেই জমিতে ভরে উঠেছিল মুলার গাছ, সেই জমি এখন ডুবে আছে বৃষ্টির পানিতে। হাতভর্তি মুলার আশা এখন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জমিতেই।

তিনি আরো বলেন, বাজারে মুলা তোলার আগেই সব শেষ হইয়া গেলো। ক্ষেতে এখন শুধু পানি আর পানি। তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, এতো ক্ষতি কিভাবে কাটিয়ে উঠবো বুঝতে পারছি না।
নভেম্বরের শুরুতে অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিতে এমন দৃশ্য এখন রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার পানিবন্দি ফসলের মাঠজুড়ে। হঠাৎ টানা দুই দিনের অতিবৃষ্টিতে জেলার হাজারো কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। শাকসবজি, ঢেঁড়স, মুলা, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে আমন ধান-সব ফসলেই লেগেছে ধ্বংসের ছাপ। কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী- ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকারও বেশি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজারের ওপর।

রাজশাহীর অন্যান্য উপজেলার মতো পবা, মোহনপুর, দুর্গাপুর, তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে এখনো পানি জমে আছে। এমন সময়ে বৃষ্টিতে হতবাক কৃষকেরা বলছেন, ১৯৮৬ সালের পরে এই এলাকায় নভেম্বর মাসে শুরুতে এতটা বৃষ্টি আগে কখনো দেখেননি।

সরেজমিনে বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) সকালে কথা হয় কৃষক রাব্বানী মন্ডল সঙ্গে। মুখে বিষণ্ণতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আষাঢ় মাসেও এমন বৃষ্টি হয় না, যে বৃষ্টি হইছে। এখনো পানি নামেনি। আরো পাঁচ বিঘা জমি এখনো পানিবন্দি, জমির চারিদিকে পুকুর তাই পানি নামতে পারছে না।’

তবে তার কণ্ঠে হতাশার সঙ্গে সঙ্গে কৃতজ্ঞতার সুরও ঝরে পড়ল- ‘কৃষি অফিসের স্যারেরা মাঠে আইছিল, খবর নিচ্ছেন। সরকার আমাদের খালি চোখে দেখেই থামেনি, বীজ-সার দিতেছে প্রণোদনা হিসেবে। আমি নিজের হাতে পেঁয়াজের বীজ আর সার পাইছি। পানি শুকালে এহন নতুন করে লাগামু। ফসল গেছে, কিন্তু হাল ছাড়মু না।’

রাব্বানী আরো বলেন, ‘আমাদের মতো গরিব কৃষকের জন্য এই প্রণোদনাই এখন একমাত্র ভরসা। সরকার যদি এইভাবে পাশে থাকে, আমরা আবারো মাঠে ফসল তুলতে পারব ইনশাআল্লাহ।’
পবা উপজেলার শিয়ালবেড়, পাইকপাড়া, দাদপুর, মুরারীপুর- অধিকাংশ গ্রামেই একই চিত্র। মাঠজুড়ে এখন পানি আর পানি। কারও জমিতে ধান হেলে পড়েছে, কারও জমিতে শাকসবজি পানির নিচে ডুবে আছে। বৃষ্টিতে মাঠজুড়ে এখন ক্ষতির চিহ্ন।
কথা হয় একই এলাকার কৃষক শহিদুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, ‘১২ কাঠা জমিতে শাকসবজি করেছিলাম। বৃষ্টিতে সব শেষ হইয়া গেছে। এমন সময় তো বৃষ্টি হয় না। এখন আবার নতুন করে লাগাইতে সময় লাগবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সব শেষ হইছে, কিন্তু সরকার পাশে আছে, বীজ-সার পাইছি, আবার চাষ করমু। কৃষকে হার মানলে চলবে না।’
পাইকপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক এক বিঘা জমিতে বি-৮৭ জাতের ধান চাষ করেছিলেন। ধান কাটার আগেই নভেম্বরে অসময়ের বৃষ্টিতে জমিতে পানি উঠেছে।

বাতাসে ধানের গাছ হেলে পড়ে। মাঠে দেখা যায়, কৃষকদল কাদামাটি মাড়িয়ে হেলে পড়া ধান কেটে নিচ্ছেন। সেখানে আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে সোহানুর রহমানের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘এই বৃষ্টিতে অর্ধেক ধান নষ্ট হয়ে যাবে। শ্রমিক খরচও বেশি হবে। মনে হচ্ছে খরচের টাকাও উঠবে না। তিন দিন পরে বৃষ্টি হইলে এই সর্বনাশ হইত না।’

দুর্গাপুর উপজেলার সিংগা গ্রামের কৃষক জাহিদ জানান, সিংগা বিলে প্রায় আধা পাকা দুই বিঘা জমির ধান গত শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) এর রাতের বৃষ্টিতে সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। আর এক সপ্তাহ হলেই তার ধান কাটা শুরু হতো। এ সময় হঠাৎ রাতের বৃষ্টিতে সব ধান তলিয়ে গেছে। এখন পানি কমতে শুরু করেছে। শুক্রবারের (৩১ অক্টোবর) বৃষ্টিতে দুই বিঘা জমিতে পানি জমে গেছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, নভেম্বরের শুরুতে অসময়ের দুই দিনের বৃষ্টিতে জেলার ৪ হাজার ২০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) দিবাগত রাত থেকে শনিবার (১ নভেম্বর) সকাল পর্যন্ত রাজশাহী জেলায় প্রায় ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এই দুই দিনে বৃষ্টিতে জেলার ২ হাজার ১৫০ বিঘা ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই বৃষ্টি ফসলের জন্য কতটা ক্ষতি করেছে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নিম্নচাপের কারণে নভেম্বরের শুরুতেই অপ্রত্যাশিতভাবে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। মাত্র দুই দিনের বৃষ্টিতে জেলার ২ হাজার ১৫০ বিঘা জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ দাড়িয়েছে প্রায় ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকা।’

তিনি জানান, ক্ষতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে শাকসবজিতে ২৬৭ লাখ টাকা, রোপা আমনে ১১৬ লাখ টাকা, পেঁয়াজে ১২৭ লাখ টাকা ও সরিষায় ১৮৫ লাখ টাকার। মোট প্রায় ৪ হাজার ২০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের তথ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এবিষয়ে মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নিবে, তা বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান তিনি।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহযোগিতার বিষয়ে পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এমএ মান্নান জানান, ‘নভেম্বরের শুরুতেই যে বৃষ্টি হয়েছে, সেটি মূলত নিম্নচাপজনিত। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে সার ও বীজ বিতরণ করা হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি যেন জমি শুকিয়ে দ্রুত নতুন ফসল লাগাতে পারেন। ইতোমধ্যে কৃষকদের সরিষা, গম, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন ধরনের ফসলের বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে।’- বলেন তিনি।