নয়া সরকারের প্রস্তুতি চলছে
অনলাইন ডেস্ক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হওয়ার পর এখন সবার দৃষ্টি নির্বাচন-পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার দিকে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক ফলাফল সংকলন ও যাচাই শেষে দুয়েক দিনের মধ্যেই গেজেট প্রকাশ করা হবে। গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আইনগত স্বীকৃতি মিলবে এবং এরপরই শুরু হবে নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশিত হবে। এর পরই নবনির্বাচিত সদস্যরা শপথ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হবেন। আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নিতে পারেন। এমন খবরে ইতোমধ্যে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নিতে রাজধানীতে আসতে শুরু করেছেন বলে সূত্রে জানা গেছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন (হার্ড কপি) ইতোমধ্যে কমিশনে এসে পৌঁছতে শুরু করেছে। ফলাফলের আনুষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই চলছে কমিশন সচিবালয়ে। তবে আজই (শনিবার) গেজেট জারি হতে পারে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর পরপরই সংসদ সদস্যদের শপথের দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী দেশের রাষ্ট্রপতি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন, অথবা তার মনোনীত ব্যক্তি এই দায়িত্ব পালন করবেন। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, সংসদের প্রথম বৈঠকের আগে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়।
এবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হওয়ায় রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বিএনপি একক দল হিসেবে পেয়েছে ২০৯টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি, খেলাফত মজলিস ১টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি ১টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি, গণঅধিকার পরিষদ ১টি আসন পেয়েছে। এ ফলাফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। নতুন সরকারের সামনে শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, গণভোটে জনগণের রায়ের প্রতিফলন ঘটানোর সাংবিধানিক দায়ও থাকবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়টি গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে সংসদের কার্যক্রমে। বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ ও বিতর্কের পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী হবে। এবার নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় নতুন সরকারের ওপর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা দ্বিগুণ। গণভোটে যে মতামত এসেছে, তা বাস্তবায়নে স্বচ্ছ রোডম্যাপ উপস্থাপন না করলে জন-আস্থায় প্রভাব পড়তে পারে।
শপথের প্রস্তুতি বঙ্গভবনে
দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে ইতোমধ্যে তোড়জোড় শুরু করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রোটোকল, নিরাপত্তা, আমন্ত্রণপত্র প্রেরণ ও অতিথি তালিকা চূড়ান্ত করার কাজও চলছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এখন ব্যস্ত সময় পার করছে। শপথ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হবে বঙ্গভবনে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হিসেবে এটিকে কেন্দ্র করে থাকবে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিটও মোতায়েন থাকবে। অনুষ্ঠানে কূটনৈতিক কোরের সদস্য, বিচারপতি, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাসহ বিশিষ্ট নাগরিকদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদ। তার নেতৃত্বে পুরো আয়োজনটি সুসংগঠিতভাবে সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সাধারণত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা নির্ধারিত ক্রম অনুসারে শপথ নেন। প্রথমে প্রধানমন্ত্রী, এরপর মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতাÑ সব মিলিয়ে অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা হবে অগ্রাধিকার। পাশাপাশি নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সহাবস্থান ও সংলাপের প্রশ্নও গুরুত্ব পাবে।
সূত্র বলছে, মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে ইতোমধ্যে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে আলোচনাও শুরু হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করা হতে পারে। বিশেষ করে অর্থ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপারে জোর দেওয়া হচ্ছে।
সংসদের প্রথম অধিবেশন
গেজেট প্রকাশ ও শপথের পর রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করবেন। প্রথম অধিবেশনেই স্পিকার নির্বাচন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন এবং কার্যপ্রণালি নির্ধারণের কাজ শুরু হবে। সংসদ কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদের প্রথম অধিবেশন হবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সেখানেই সরকার তার নীতিগত অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনার ইঙ্গিত দেবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলের ভূমিকা ও সংসদীয় বিতর্কের মানও স্পষ্ট হবে।
নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের ছিল সজাগ দৃষ্টি। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্বাচনের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেছে। গেজেট প্রকাশ ও নতুন সরকার গঠনের পর আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বার্তা আসতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ভূমিকা রাখবে। ফলে নতুন সরকারের প্রথম দিকের কূটনৈতিক তৎপরতা গুরুত্ব বহন করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা পেল। এখন দৃষ্টি নতুন সরকারের কর্মসূচি ও বাস্তবায়নের দিকে। গেজেট প্রকাশ, শপথ গ্রহণ এবং নতুন মন্ত্রিসভার দায়িত্ব গ্রহণÑ এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে আগামী পাঁচ বছরের শাসন কাঠামোর ভিত্তি।
বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠান শুধু আনুষ্ঠানিক নয়, এটি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনৈতিক বার্তার মঞ্চও। শপথের ভাষণ, মন্ত্রিসভার গঠন ও উপস্থিত অতিথিদের তালিকাÑ সবই ইঙ্গিত দেয় সরকার কোন দিকে অগ্রসর হতে চায়।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ ও গবেষক অর্থনীতিবিদ ড. এম এ তাসলিম বলেন, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান। জনগণ নির্বাচনে যে প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে, তার বড় অংশ অর্থনৈতিক স্বস্তির সঙ্গে যুক্ত। তিনি পরামর্শ দেন, দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা উচিত। রাজস্ব আহরণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগÑ এই তিন খাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভুইয়া বলেন, শপথের পরপরই প্রশাসনিক সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ভূমিকা এখানে মুখ্য। নতুন মন্ত্রিসভার অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে নীতিনির্ধারণ দ্রুত এগোবে।
তিনি আরও বলেন, প্রথম ছয় মাসে সরকারের কর্মকৌশল স্পষ্ট না হলে আমলাতন্ত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। তাই স্পষ্ট নির্দেশনা ও জবাবদিহিতার কাঠামো জরুরি।
কূটনৈতিক ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক আস্থা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীম উদ্দিন খানের মতে, নির্বাচন ও গণভোট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীরভাবে পর্যবেক্ষিত হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারলে বিদেশি বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা হবে বড় পরীক্ষা।
বিশ্লেষকদের সামগ্রিক মূল্যায়ন-ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেও এখন মূল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন। তবে রাজনৈতিক স্থিতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটÑ এই তিনটি বিষয় নির্ধারণ করবে সরকারের সাফল্য কতটা টেকসই হবে।