প্রতিশ্রুতি পূরণে অগ্রগতি, আছে সমালোচনাও
অন্যদিকে, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে দাম বৃদ্ধি না হলেও সংকট মোকাবিলায় ‘সঠিক ব্যবস্থাপনা’ করতে না পারা, সড়কের চাঁদাবাজি নিয়ে মন্ত্রীর অতিরিক্ত বক্তব্য, মব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করা নিয়ে সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে নতুন এই সরকার। এছাড়া দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের অন্তর্কোন্দল ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে এ সময়ে বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তিও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সর্বশেষ ২০০৮ সালে প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আবার ১৭ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে বিএনপি।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ২১ দিনের মাথায়, ১০ মার্চ নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর ১৪ মার্চ ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য সরকারি মাসিক সম্মানী ভাতা কার্যক্রম চালু করা হয়। ১৬ মার্চ খাল খনন কর্মসূচি এবং সর্বশেষ ১৪ এপ্রিল কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
এছাড়া এ সময়ের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ১২৯ জন ক্রীড়াবিদের হাতে ক্রীড়া কার্ড তুলে দেয় সরকার।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত কিছু উদ্যোগও সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে– যানজটের বিষয়টি বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরের সংখ্যা কমানো, সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার অফিস করা এবং সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের সময়মতো উপস্থিতি নিশ্চিত করা, সরকারি গাড়ির পরিবর্তনে ব্যক্তি গাড়ি ব্যবহার করা–এসব ইতিবাচক পদক্ষেপ।
সরকারের প্রথম ২ মাসের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতিগুলো করেছিলেন, তার অনেক কাজই শুরু করতে পেরেছেন। এরমধ্যে খানকাটা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। আমি মনে করি, এটা আমাদের সফলতা। শুরুটা আমরা ভালোভাবে করতে পেরেছি।
একইভাবে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খননসহ বিভিন্ন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল নিয়ে বিশ্বে তোলপাড় হলেও আমরা তেলের দাম বাড়াইনি। তেল নিতে পাম্পে গাড়ির দীর্ঘ লাইন থাকলেও মানুষ তেল পাচ্ছে।’
সরকারের দুই মাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এই দুই মাসে দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিকভাবে নানা সংকট তার মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম স্বাভাবিক রাখা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পেরেছে সরকার। বিশেষ করে রমজান মাসে অতীতে যেভাবে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হতো, এবার কিন্তু সেটা পারেনি। সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিল পণ্যের দাম।’
তিনি আরও বলেন, আমি বলবো- সবকিছু মিলিয়ে বিগত দুই মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যে সাফল্য দেখিয়েছে, এটা অভূতপূর্ব। এই রকম দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই যে, সমস্ত দিকের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) যে সাফল্য অর্জন করেছেন, বিশেষ করে জিনিসপত্রের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা, মধ্যপাচ্যের এই সংকটের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানো- এগুলো বড় ধরনের সাফল্য।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের ত্রৈমাসিক (জানুয়ারি থেকে মার্চ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৯০৫ জন আহত এবং ৮ জন নিহত হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি দেখানো, চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগ উঠে। যার কারণে নতুন সরকারের ভাবমূর্তিও সংকটে পড়ে। যদিও এরমধ্যে দলের অভ্যন্তরে সহিংসতা, সংঘর্ষের ঘটনায় তৃণমূলের একাধিক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে আলোচিত ‘মব সন্ত্রাস’ এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি বর্তমান সরকার। এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে মব সহিংসতায় ৪৯ জন নিহত এবং ৮০ জন আহত হয়েছেন। সর্বশেষ ১২ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এবং কথিত পীর আব্দুর রহমান নিহত হওয়ার পর সারাদেশে সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
তবে রুহুল কবির রিজভী দাবি করেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন যে রকম আছে, এর চাইতে ভালো কখন ছিল না।’ জ্বালানি তেলের সংকট ও সংকট মোকাবিলায় দুর্বল ব্যবস্থা নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। সংসদে বিরোধী দলের কোনো কোনো সংসদ সদস্য সংসদে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পাওয়ার অভিযোগ তুলেন।
এই নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সংসদে বিবৃতি দিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের মধ্যেও দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। মজুত থাকা জ্বালানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ডিজেল। এর পরিমাণ এক লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৪ টন। এছাড়া অকটেন ১০ হাজার ৫০০ এবং পেট্রোল ১৬ হাজার টন মজুত রয়েছে।
অবৈধ মজুত বন্ধে, ৩ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪২টি অভিযান পরিচালনা করা এবং ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৪৫৬ লিটার জ্বালানি উদ্ধারের তথ্য দেন মন্ত্রী।
অন্তবর্বর্তী সরকারের জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গুম প্রতিরোধ, গণভোটসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ পাস না করায় সংসদে বিরোধী দল কর্মসূচি পালন করে। অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি), সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সরকারের সমালোচনা করে বক্তব্য ও বিবৃতি দিয়েছে।
‘মানবাধিকার সুরক্ষা ও স্বাধীন বিচার বিভাগ-সম্পর্কিত অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে নাগরিক ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’–শীর্ষক এক আলোচনা সভায় সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে প্রণীত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ রহিত করা হলো। আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না যে কেন বিএনপি এ কাজটা করল?’
২০১৮ সালের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বদিউল আলম বলেন, উচ্চ আদালতে গিয়ে বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে জামিনের জন্য ধরনা দিতে দেখেছি। কী করুণ অবস্থা! অনেক নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে আদালতে গিয়েও তারা প্রতিকার পাচ্ছিলেন না। এখন বর্তমান বিএনপি সরকার এই যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে, তারা অতীত থেকে অবশ্যই শিক্ষা নেয়নি।
গতকাল ১৬ এপ্রিল রাষ্ট্রীয় এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জনগণের রায়ে আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার আগেই আমরা বিস্তারিতভাবে দেশের জনগণের সামনে দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করেছিলাম। রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার নিয়ে আমরা প্রকাশ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য স্বাক্ষর করেছিলাম। জনগণ আমাদের প্রতিটি অঙ্গীকারের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এবার আমাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পালা। আমরা ইতোমধ্যেই জনগণের সামনে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি। আমরা দলীয় ইশতেহার এবং স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফার প্রতি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবো। আমি বিশ্বাস করি ব্যক্তিগতভাবে। পুঁথিগত পরিবর্তনের চেয়ে মানসিকতার পরিবর্তন বেশি জরুরি। বিএনপি সরকার যতবার রাষ্ট্র পরিচালনা সুযোগ পেয়েছে বারবার এর প্রমাণ দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, ঐতিহাসিক সত্য মেনে নিতে দ্বিধাচিত্ত থাকা হীনম্মন্যতার পরিচায়ক।